Image
  • Monday, 17 June 2024
শেখ ফজলুল হক মণি

শেখ ফজলুল হক মণি

শেখ ফজলুল হক মণি

পরিবার: 

 

শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৩৯ সালের ৪ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন দরবেশ শেখ আউয়ালের বংশধর, যাঁরা উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলাম সাধক হজরত বায়েজীদ বোস্তামী (রা.)-এর ধর্ম প্রচারে সহচর ছিলেন।

 

শেখ ফজলুল হক মনির পিতা তদানীন্তন ফরিদপুর মহকুমার জমিদার কুদরত উল্লাহ শেখের (কুদ শেখ) পুত্র নূরুল হক।তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ব্রিটিশ সরকারের (এজিবির) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এবং শেখ মনির মাতা আছিয়া বেগম ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় বোন।

 

শৈশব থেকেই আপন মামা এবং বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদরে-অনুকরণে বেড়ে উঠেছেন শেখ ফজলুল হক মনি। সে সময় থেকেই পাকিস্তানি শাসন-শোষণ বঞ্চনার দাহ্য শেখ মনির রাজনৈতিক দ্রোহে প্রকাশিত হতে থাকে।

 

শেখ ফজলুল হক মনির স্ত্রী আরজু মনি সেরনিয়াবাত। শেখ ফজলুল হক মনির দুই সন্তান: শেখ ফজলে শামস্ পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপস।

 

পড়াশোনা:

 

মধুমতী নদীর তীরভূমি টুঙ্গিপাড়ার সবুজ-শ্যামল গ্রামে শৈশব স্মৃতির মোহমায়া ছেড়ে শেখ ফজলুল হক মনি লেখাপড়ার সুবাদে ঢাকায় আসেন একবুক স্বপ্ন নিয়ে। অধ্যয়ন শুরু করেন নবকুমার ইনস্টিটিউটে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে এবং ১৯৫৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৬০ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হয়ে এই শিক্ষপ্রতিষ্ঠান থেকেই বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৬২ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। এ ছাড়া কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৬৭ সালে আইনশাস্ত্রে এলএলবি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন বাংলার এই সূর্যসন্তান।

 

৬২ শিক্ষা আন্দোলনের নায়ক শহীদ শেখ ফজলুল হক মণি:

 

ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬০-১৯৬৩ সালে তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি গ্রেফতার হন এবং ছয় মাস কারাভোগ করেন।

 

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ধর্মঘট ও সামরিক আইন অমান্য করে রাজপথে মিছিল বের করলে পুলিশ লাটিচার্জ-টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে।

 

৭ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনজুর কাদের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে এলে ছাত্র সমাজ কর্তৃক বাধাগ্রস্ত ও চরমভাবে লাঞ্ছিতসহ তার গায়ে থু থু ছিটিয়ে দেয় ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

 

৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর ছাত্ররা হল ত্যাগ করছে না দেখে পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে ছাত্রদের জোর করে বের করে দেয়। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে পুলিশবেষ্টনির মাঝে আটকা পরেছিল আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। এদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা আগেই জারি হয়েছিল। যা বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল।

 

৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৯ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে।

 

সকল বন্দী রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের মুক্তিদান, বাংলা হরফের রদবদলের বন্ধের দাবী জানিয়ে ছাত্র সমাজ সরকারকে ৭ দিনের চরমপত্র দেয়ায় ৩১ মে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় পুনঃ বন্ধ ঘোষণা করে।

 

দেশব্যাপী এই শিক্ষা আন্দোলনকে গতিময় করে তুলতে ৬২-র ২ আগস্ট তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণি, ডাকসুর সহ-সভাপতি শ্যামা প্রসাদ ঘোষ ও জি.এস. এনায়েতুর রহমান সহ বাম সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে জেলাসমূহে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি গ্রেফতার হন।

 

১৯৬২’র দ্বিতীয়ার্ধে সরকার ঘোষিত শিক্ষানীতির প্রতিবাদে আন্দোলন আবার বেগবান হয়ে ওঠে।প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ১০ আগস্ট ঢাকা কলেজের ক্যান্টিনে বিভিন্ন কলেজ প্রতিনিধিদের নিয়ে একসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ও ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ছাত্র সমাজের দাবী পূরণে স্বৈরাচার সরকারের অনীহার প্রতিবাদে ১৫ আগস্ট সমগ্র দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয় এবং ২৮ তারিখ পর্যন্ত ধর্মঘট ও মিছিল অব্যাহত থাকে।

 

বরাবরের মতোই সেই দুঃস্বপ্নের সময়ে বাংলার দিশেহারা লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সারথি হয়ে রাজপথে নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠনটি ইতোপূর্বে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলতা অর্জন করে গণমানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। ফলে, কুখ্যাত শরীফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রলীগ হয়ে উঠে ছাত্র-জনতার দুর্দিনের কান্ডারী।

 

সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। পূর্ব বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ কর্মসূচী চলতে থাকে। আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স এবং উচ্চ মাধ্যমিক ইংরেজির অতিরিক্ত বোঝা বাতিল করার বিষয়টি।

 

একের পর এক ধর্মঘট সমাবেশের কর্মসূচি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন অচলাবস্থার সৃষ্টি করে, তেমনি ক্রমেই এই আন্দোলনের শ্রমজীবী ও পেশাজীবী বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, আন্দোলনটিকে ‘গণ-আন্দোলনে’ রূপান্তরিত করে।

 

কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবী সম্বিলিত এক চরমপত্র পেশ করে। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবীসমূহ হল : ১) শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিল, (২) ৩ বছরের পাস ডিগ্রি কোর্সকে ২ বছর করা, ৩) দ্বাদশ শ্রেণি প্রবর্তন বন্ধকরণ, ৪) বর্ধিত ছাত্র বেতন ও পাঠ্য পুস্তকের মূল্য হ্রাস, ৫) কলা ও বিজ্ঞান বিভাগ হতে যথাক্রমে বিজ্ঞান ও কলা বিষয় বাদ দেয়া, ৬) দ্বাদশ শ্রেণির ৭টি ইংরেজি বইয়ের স্থলে ২টি করা, ৭) উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগকে ডিগ্রী কলেজের সাথে পুনঃ একত্রীভূতকরণ, ৮) জনগণের গড়পড়তা আয় অনুপাতে শিক্ষার ব্যয় হ্রাস করা, ৯) বন্দী ছাত্রদের মুক্তিসহ হুলিয়া ও বহিস্কারাদেশসহ রুজুকৃত মিথ্যা মামলাসমূহ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা, ১০) কলেজ শিক্ষকদের মর্যাদা সি.এস.পি অফিসার পদের সমমর্যাদাকরণ ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধিকরণ এবং ১১) পূর্ব পাকিস্তানে প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করে অবিলম্বে জনসংখ্যা ভিত্তিতে ন্যায্য অধিকার দেয়া।

 

কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মেনে নেয়ার সময় বেঁধে দেয়, কিন্তু পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুল কাদের চৌধুরী দাবী সমূহকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করে ১০ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে।

১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের সামনে অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি বাতিল করে। তবে তার পরিবর্তে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে।

 

১০ সেপ্টেম্বর সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। সরকারের প্রত্যাশা ছিল সোহরাওয়ার্দী মুক্ত হলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়বে। কিন্তু এই আশা-দুরাশায় পরিণত হয়।

 

১১ সেপ্টেম্বর সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবীর প্রতি সমর্থন করে তা মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অন্যথা এর পরিণতি কঠোর হবে বলে হুঁশিয়ারী জ্ঞাপন করেন।

 

১৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশে অভূতপূর্ব হরতাল ও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। রাজপথে নেমে আসে রাজধানী ঢাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ। সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে উপস্থিত হয়। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়ে যায়। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে এ গুজব শুনে মিছিল দ্রুত নবাবপুরের দিকে ধাবিত হয়। হাইকোর্টে পুলিশের সাথে সংঘাতে না গিয়ে মিছিল আব্দুল গনি রোড ধরে যেতে থাকে। পুলিশ তখন পিছন থেকে মিছিলে হামলা চালায়। লাঠি চার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ও গুলি চালায়। পুলিশের সাথে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ বাঁধে ঢাকা কোর্টের সামনে। এখানেও পুলিশ ও ইপিআর গুলি চালায়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হন বাবুল এবং বাস কন্ডাক্টর মোস্তফা। গৃহভৃত্য ওয়াজিউল্লাহ গুরুতর আহত হয় এবং তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

১৭ সেপ্টেম্বর কার্যত ছাত্রসমাজের অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ঐ দিনের বিক্ষোভ মিছিলে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই প্রধান হয়ে ওঠে।ওই দিন শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে মিছিলের উপর পুলিশ হামলা চালায়। টঙ্গিতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিককে।

 

১৭ সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ছাত্রসমাজ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। একপর্যায়ে সরকার নমনীয় হতে বাধ্য হয়। ছাত্রসমাজ ও আন্দোলনকারী জনগণের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর গোলাম ফারুকের সাথে আলোচনায় বসেন।

 

২৪ সেপ্টেম্বর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম পল্টন ময়দানে জনসভা আহ্বান করে। ঐ জনসভা থেকে সরকারের প্রতি ‘চরমপত্র’ দেওয়া হয়।

 

ইতোমধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে গভর্নর গোলাম ফারুকের কয়েক দফা বৈঠক হয়। ছাত্রসমাজের এই ‘চরমপত্র’ দেওয়ার তিন দিন পর, সরকার শরীফ কমিশন রিপোর্ট স্থগিত ঘোষণা করে। ডিগ্রি কোর্সের ছাত্রদের, যাদের দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল এবং তৃতীয় বর্ষে উঠেছিল তাদের বিনা পরীক্ষায় সবাইকে পাস ঘোষণা করা হয়। গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মুক্তি দেওয়া হয়। অবশেষে বিজয়ের ভেতর দিয়ে বাষট্টির গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৬৩ সাল থেকে ছাত্রসমাজ ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রতিবছর ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৭ সেপ্টেম্বর জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শেখ ফজলুল হক মণি সহ অন্যদেরকে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর‌ এর আন্দোলনের শহীদ বাবুল, মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহ কে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা নির্মাণে শেখ ফজলুল হক মনির অবদান। ‌

 

১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশন আন্দোলনের ফলে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার মার্শল ল প্রত্যাহার করে মৌলিক গণতন্ত্র ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এ সময় ছাত্রলীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি আবার সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি আধুনিক চিন্তাধারার সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের প্রতিবাদী কৌশল অবলম্বন করে ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম এবং পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। যে কারণে ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা তৈরির ইতিহাসে শেখ ফজলুল হক মনির আকণ্ঠ দেশপ্রেম ও বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রতিবাদী কল্পকাহিনি গচ্ছিত রয়েছে।

 

১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করে নতুনভাবে ছাত্র রাজনৈতিক তত্পতরা বৃদ্ধির পাশাপাশি ছাত্রলীগের দলীয় পতাকা এবং মনোগ্রাম প্রকাশের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলার অর্থ-সম্পদ, ন্যায্যতা লুণ্ঠনের প্রতিবাদে সংগ্রামের প্রতীকী বার্তা দেন শেখ ফজলুল হক মনি।

 

তাঁর অনুরোধেই দেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকার মৌলিক ধারণা প্রণয়ন করেন। এ কাজে সহযোগী হিসেবে যুক্তি-পরামর্শদানের জন্য বিখ্যাত বাংলা লৌকসাহিত্য শিল্পী অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন সাহেবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

 

শেখ ফজলুল হক মনির দেশপ্রেমে সংগ্রাম ও প্রতিবাদের কৌশলগত রূপরেখায় চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক ও চিরায়িত বাংলার ঐতিহ্য নৌকাকে চলমান, প্রগতিশীল বিবেচনায় ছাত্রলীগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চলমান ও প্রগতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছাত্রসংগঠনের মনোগ্রামের মধ্যাংশে নৌকার আকৃতি ব্যবহার করেন এবং তত্কালীন পূর্ব বাংলার সোনালি আঁশ ছিল ‘পাট’। যেহেতু পূর্ব বাংলার কৃষি খাতের স্বর্ণালি ফসল পাটের রপ্তানীকৃত লাভজনক অর্থের বেশির ভাগই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা অন্যায্যভাবে নিয়ে যেত; সেই প্রতিবাদে ছাত্রলীগের মনোগ্রামের দুই পাশে পাট পাতা আকৃতির ব্যবহার করা হয়েছে এবং শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির উদ্দেশ্য সামনে রেখে তিন তারকা চিহ্ন এবং স্পষ্ট বাংলা অক্ষরে ওপরে পূর্ব বাংলা ও নিচে ছাত্রলীগ লিখে চিরায়িত বাংলার ঐতিহ্য গাঢ় সবুজ রঙের পটভূমি ব্যবহারে করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম প্রস্তুত করা হয়েছিল।

 

একই চিন্তাধারায় শেখ ফজলুল হক মনির পরামর্শক্রমে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে শান্তির রং সাদা পটভূমিতে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে তিনটি অগ্নিশিখা চিহ্নের ওপর শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির মন্ত্রে লাল রঙের তিন তারকা চিহ্নের রূপ দিয়ে ছাত্রলীগের দলীয় পতাকার আকৃতি নিরূপণ করেছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন।

 

অবশ্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের এই রূপকল্প অনুযায়ী ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা তৈরির শিল্পকর্মে শেখ ফজলুল হক মনির সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের প্রতিবাদী বার্তায় বাঙালির ন্যায্য অধিকার লুণ্ঠনের চিত্রকর্ম চমত্কারভাবে ফুটিয়ে তুললেন তাঁরই ছাত্র তখনকার নামকরা চিত্রশিল্পী হাশেম খান। যা আজও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দলীয় মনোগ্রাম ও পতাকা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এভাবেই বাঙালি জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী পথচলায় ছায়াসঙ্গী হয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামের বীজ বপনে ধারাবাহিকভাবে অবদান রাখেন শেখ ফজলুল হক মনি।

 

৬ দফা আন্দোলন ও শেখ ফজলুল হক মণি

 

বাঙালি জাতির স্বকীয় মহিমায় আত্মপ্রকাশ আর আত্মনির্ভশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি ‘ছয় দফা’র
 অন্যতম দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের সম্মেলনের পূর্বদিন সাবজেক্ট কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করলে সম্মেলনের উদ্যোক্তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। পরের দিন পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় ছয় দফা সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসাবেও চিত্রিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলন বর্জন করেন। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফার পক্ষে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়। জনমত আদায় ও আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসাবে ‘আমাদের বাঁচার দাবি-ছয় দফা কর্মসূচি’ শীর্ষক পুস্তিকাও প্রণীত হয়।

 

শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন এ আন্দোলনের একনিষ্ঠ ও সফল সংগঠক। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচিকে জনপ্রিয় ও সফল করতে তিনি রেখেছেন যুগান্তকারী ভূমিকা। ‘ছেষট্টির সাত জুন-প্রস্তুতি পর্ব’ নিবন্ধ পাঠে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু জেলে থাকায় এবং মওলানা ভাসানীর ন্যাপসহ আরও কিছু সংগঠনের আপত্তি থাকায় ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন আদায় এবং হরতাল সফল করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। ৭ জুন ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ওই নিবন্ধে শেখ মণি লিখেছেন, ‘...জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু জানতে চেয়েছেন হরতালের প্রস্তুতি কতদূর কী হলো সেটি সম্পর্কে। গভীর রাতে পেছনের দেওয়াল টপকিয়ে ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গেলাম। মামিকে বিস্তারিতভাবে সবকিছু জানিয়ে বললাম রাতের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। হরতাল হবেই।’ ‘মানিক মামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বললেন, ইত্তেফাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও তিনি পিছপা হবেন না। শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য তিনি সবকিছু করবেন।

 

১৯৬৬ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ মাজহারুল হক বাকি ও আব্দুর রাজ্জাক। শেখ  মণি  ঢাকা- নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের পথসভা ও গেট সভা করতে বললেন এবং সমস্ত ঢাকাকে ১১টা ভাগে ভাগ করে দায়িত্ব বণ্টন করে দিলেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুনিরুল ইসলাম, আলী আহমেদ (চুনকা ভাই), গোলাম মূর্শীদ (এস.সি.এ), আনসার সাহেব, চকবাজারের রিয়াজুদ্দিন ও নাজিরা বাজারের সুলতান সাহেব, ফজলুর রহমান, নিজাম সাহেব পুরাতন ঢাকার। নতুন ঢাকার কর্মীদের পরিচালনা জন্য আনোয়ার চৌধুরী, ময়েজউদ্দিন আহমেদ, নুরুল ইসলাম। মিসেস আমেনা বেগম ও গাজী গোলাম মোস্তফা সবকিছু দেখা শুনা করার দায়িত্ব দিলেন। ছাত্রদের ১১টা গ্রুপের সার্বিক নেতৃত্বের ভার দিলেন মিজান চৌধুরীকে। তেজগাঁও, আদমজী পোস্তগোলাসহ শ্রমিকদের তিনি সংগঠিত করেছিলেন। এমনকি মানিক মিয়া বললেন, ইত্তেফাকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও তিনি পিছপা হবেন না। তিনি আরো আশ্বাস দিলেন, হরতালের কর্মসূচি যাতে করে সব কাগজে ছাপা হয় তার জন্য প্রভাব বিস্তার করবেন। বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকে জানতে চেয়েছেন হরতালের প্রস্তুতি কতদূর কি হলো? গভীর রাতে পিছনের দেওয়াল টপকিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তার মামিকে সবকিছু বিস্তারিত জানিয়ে বললেন, রাতের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর নিকট খবর পৌঁছে দাও হরতাল হবেই। ওই হরতাল সফল না হলে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম পিছিয়ে যেত। মোনায়েম খান শেখ মণিকে গ্রেফতার করেন; তিনি মুক্তি পান ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর। ( সূত্র: ৭ জুন ১৯৭২ বাংলার বাণী)


৭ জুনের হরতালকে সফল করতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি। ওই হরতালে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ কমপক্ষে ১১ জন বাঙালি শহিদ হয়েছেন। ইতিহাসবিদরা বলেন, ৭ জুনের হরতাল সফল না হলে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম পিছিয়ে যেত। ছয় দফা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকার কারণে শেখ মণির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারিসহ আটটি মামলা করা হয়েছিল। ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘ছয় দফা প্রস্তাব জনগণের সামনে পেশ করার পর থেকে সরকার আমার ওপর অত্যাচার চালাইয়া যাচ্ছে। ...আমার ভাগনে শেখ ফজলুল হক মণি ও আরও অনেকে ১৯৬৬ সাল থেকে জেলে আছে এবং সবার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।’


বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলেও তার বিশ্বাস ছিল একমাত্র তার মণি-ই হরতাল সফল করে তুলবেন। বঙ্গবন্ধু সেভাবেই তাকে প্রস্তুত করেছিলেন। শেখ মণি বলেছেন, “...জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু জানতে চেয়েছেন হরতালের প্রস্তুতি কতদূর কী হলো সেটি সম্পর্কে। গভীর রাতে পেছনের দেওয়াল টপকিয়ে ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গেলাম। মামিকে বিস্তারিতভাবে সবকিছু জানিয়ে বললাম রাতের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। হরতাল হবেই।” (‘ছেষট্টির সাত জুন: প্রস্তুতি পর্ব’, দূরবীনে দূরদর্শী)

৭ জুনের হরতাল সফল করতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি।এবারেও তাঁকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ দুই বছর আট মাস কারান্তরীণ রাখা হয়।

#বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বিভিন্ন প্রসঙ্গে শেখ ফজলুল হক মণি 

বঙ্গবন্ধু ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থের ২০২, ২০৯, ২১০, ২১৩, ২২৩, ২৩৫, ২৪০, ২৮১, ২৪৮, এবং ২৬৩ নং পৃষ্ঠায় বিভিন্ন প্রসঙ্গে শেখ ফজলুল হক মণি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ছাত্র নেতৃত্ব দিতে গিয়ে, স্বাধিকার আন্দোলন সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার কারণে শেখ মণিকে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কারাভোগ করতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে ধারাবাহিকভাবে কারাজীবনের কথা তুলে ধরা হয় সেখানে দুটি খাতা ছিলো। প্রথম খাতাটা ১৯৬৬ সালে লেখা আর দ্বিতীয় খাতাটা ১৯৬৭ সালে। দ্বিতীয় খাতায় কারাগারের জীবনযাপন, ব্যক্তিগত ভাবনা, পারিবারিক কথা ছাড়াও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনেক কথাই এ খাতায় লিখেছেন।

কারাবাসের নির্মম জীবনকথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন: “ন্যাপের হালিম, ভাগ্নে মণি পুরানা হাজত থেকে তারা এসেছে। এক জেলে থাকি আমার ভাগ্নে আমার সাথে দেখা করতে পারে না। কি বিচার!” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ.২০২)। ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বেগম মুজিব, শেখ রেহেনা ও শেখ রাসেল জেল গেটে জন্মদিনের কেক আর ফুল নিয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু বলেন, “রাসেলকে দিয়েই কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেল গেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো। কিছুটা আমার ভাগ্নে মণিকে পাঠাতে বলে দিলাম জেলগেটে থেকে। ওর সাথে তো আমার দেখা হবে না, এক জেলে থেকেও।” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ. ২১০)।

 

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের কর্মসূচির অন্যতম প্রণেতা শেখ ফজলুল হক মণি

 

শেখ ফজলুল হক মণি  ছিলেন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের কর্মসূচির অন্যতম প্রণেতা। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী শেখ ফজলুল হক মণি সত্তরের নির্বাচনী কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন, পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশকে ৬ দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক-বিমা ও ভারী শিল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য, পাট ও তুলা ব্যবসা জাতীয়করণ, পূর্ব পাকিস্তানের জায়গিরদারি, জমিদারি ও সর্দারি প্রথার উচ্ছেদ, ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ, শ্রমিকদের ভারী শিল্পের শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ার ও বাস্তুহারাদের পুনর্বাসন ইত্যাদি। (স্মরণীয়-বরণীয়, ব্যক্তিত্ব, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-পৃ:৪৬১)।

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনী

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান গেরিলা বাহিনী মুজিব বাহিনী শেখ মণির নির্দেশে ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত এবং পরিচালিত হয়। 


মুজিব বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত আওয়ামী লীগ ও এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে এ বাহিনী গঠন করা হয়। প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের এ বাহিনীকে চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং এর নেতৃত্বে ছিল ১৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমান্ড। প্রথমদিকে সেক্টর কমান্ডাররা ভারতের ব্যারাকপুর, শিলিগুড়ি, আগরতলা ও মেঘালয় থেকে নিজ নিজ বাহিনী পরিচালনা করতেন। এ বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডার ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাক।  ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল উবানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেরাদুন পাহাড়ি এলাকায় এ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে শেখ মণি ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুজিববাহিনীর অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্বাধীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা; যা মুজিববাদের অন্যতম লক্ষ্য। ধারণা করা হয় মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্বের প্রয়োজন মোকাবেলার জন্য মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল।

যুদ্ধক্ষেত্রে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে মুজিব বাহিনী যুদ্ধ করেছে। তারা দখলদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম রণাঙ্গন এবং ঢাকার আশেপাশে বেশ কিছু দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে। মুজিব বাহিনীর সদস্যরা গেরিলা রণকৌশল বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিল এবং তারা ছিল তুলনামূলকভাবে উন্নত অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত। স্বাধীন-সার্বভৌম লাল সবুজের পতাকা খচিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এই মুজিব বাহিনীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য।

 

যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি

 

স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনসহ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পুণর্গঠনের কাজ শুরু হয়। পাকিস্তানী শোষকদের দীর্ঘ শোষণ, ব্যঞ্জনা, অন্যায়ের পর লাখো শহীদের রক্ত ও মা-বোনের মহান ত্যাগ, কোটি বাঙালির আবেগের ফসল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পরই নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন দেশ ও জাতি। ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর শেখ ফজলুল হক মণির হাত ধরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক যুব কনভেনশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সারাদেশে যুবশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করে। সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তৎকালীন যুবলীগ সারাদেশে তাদের কর্মযজ্ঞ শুরু করে। শেখ মণির বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে খুব অল্পদিনের মধ্যেই যুবলীগ সময়োপযোগী সংগঠন হিসেবে প্রমাণিত হয়। শেখ ফজলুল হক মনির দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে যুবলীগ অল্পদিনে আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি হয়ে ওঠে।

 

বহুমাত্রিক শেখ ফজলুল হক মণি

 

১৯৬৩ সালেই দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার তত্ত্বাবধানে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত হন শেখ ফজলুল হক মণি। 

সৃজনশীল লেখক শেখ মনি রচিত গল্পের সংকলন ‘বৃত্ত’ ১৯৬৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।  ১৯৭২ সালে ‘গীতারায়’ নামক গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যা ২০২০ সালে তৃতীয় মুদ্রণ বের হয়েছে। ‘গীতারায়’ গল্পগ্রন্থে মোট ৬টি গল্প আছে। গল্পগুলোর শিরোনাম হচ্ছে- বৃত্ত, ব্যর্থ, জাত, অবাঞ্ছিতা, হোঁচট এবং গীতারায়।

গীতারায়  বাংলাদেশের গণহত্যা সম্পর্কিত তাঁর সর্বাধিক আলোচিত ও ঐতিহাসিক সম্পাদনামূলক গ্রন্থ। তার লেখা উপন্যাস ‘অবাঞ্ছিতা’ পাঠক সমাদৃত।

১৯৭০ সালের ১১ জানুয়ারি  শেখ ফজলুল হক মণির সম্পাদনায় সাপ্তাহিক বাংলার বাণী পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকাতে রূপান্তরিত হয়। 

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে দেশের তরুণ যুবসমাজে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটাতে হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালের ২৩ আগস্ট তিনি বিনোদন ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক সিনেমা’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন তার সম্পাদনায় দৈনিক ইংরেজী পত্রিকা ‘বাংলাদেশ টাইমস’ প্রকাশিত হয়।


‘দৈনিক বাংলার বাণী ও দি বাংলাদেশ টাইমস’ পত্রিকায় একই সঙ্গে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায়ই সম্পাদকীয় লিখতেন তিনি। 

এভাবেই পাকিস্তানিদের বর্বরতা, ধর্ষণ, গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের সার্বিক ফিরিস্তি তুলে ধরে বিশ্ব নজরে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতেন দেশপ্রেমিক লেখক শেখ ফজলুল হক মনি।

 

শেখ ফজলুল হক মনি বাংলার বাণীতে ‘দূরবীনে দূরদর্শী’ নামে কলাম লিখতেন। মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তার লেখা কলামগুলোকে সংগ্রহ করে আগামী প্রকাশনী প্রকাশ করেছে ‘দূরবীনে দূরদর্শী’ নামক গ্রন্থ, যাতে সম্পাদনা করেছেন ফকীর আবদুর রাজ্জাক ও বিমল কর।

 

শেখ মণি’র জীবনদর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিলো প্রখর দূরদর্শিতাসম্পন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। তার চিন্তা চেতনার প্রখরতা ছিলো খুবই গভীর ও দার্শনিকতাপূর্ণ। তিনি বলেন- “রাজনৈতিক যুদ্ধে আমাদের পরাজিত করতে পারে এমন শক্তি বাংলাদেশে সহজেই জন্মাবে না। কিন্তু আমাদের সমাজনীতি, অর্থনীতি যদি ব্যর্থ হয়ে যায় তাহলে রাজনীতিটাই টিকবে না”।

 

মেজর জেনারেল উবানের স্মৃতিচারণে শেখ মণি: 

 

১৯৭১ সালে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আরএডব্লিউর সাথে যুক্ত মেজর জেনারেল উবান শেখ মনি সম্বন্ধে  বলেন, "উচ্চ সংস্কৃতিবান মানুষটি (শেখ মণি)কথা কম বলতেন। তাঁর হাসি বের হয়ে আসতো একদম সরাসরি হৃদয়ের ভেতর থেকে এবং সে হাসি ছিল সংক্রামক। তাঁকে হাসতে দেখে আমার ভালো লাগতো। "

উবানের স্মৃতিচারণে দেখা যায়, ‘প্রচণ্ড আত্মশক্তিতে বলীয়ান এই মানুষটি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় অসুস্থ থাকতেন। কিন্তু কাজ করা বন্ধ করতেন না। অদম্য সাহসের অধিকারী এই লোকটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ ভূমিতে প্রকৃত যুদ্ধের সময় আমার সঙ্গে ছিলেন। মণির সঙ্গে সাক্ষাতে আমি বুঝেছিলাম তিনি প্রশংসনীয় গুণের অধিকারী অমিত আত্মত্যাগের মনোভাবসম্পন্ন। তাদের কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত এক ছোট সুদর্শন বালকের ওপর অসহ্য নির্যাতন হয়েছিল। ঢাকার পতনের পর শেখ ফজলুল হক মণি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি মুজিব বাহিনীর একটি অসুস্থ বালককে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা নিয়ে যেতে পারেন কিনা। পরে উবান যখন ঢাকায় আসেন, তখন দেখেন শেখ মণি কম বয়সী ছেলেকে সাথে নিয়ে তার আকাশযানের দিকে আসছেন। তিনি বুঝতে দেরি করলেন না, এই সেই ছেলে যাকে শেখ মণি
ঢাকায় পাঠিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন। এই হলো শেখ 
মণি যার ধ্যানে-জ্ঞানে ছিল মনুষ্যত্ববোধ।

 

শেখ মণির বক্তৃতার প্রশংসা: 

 

ভারতীয় কংগ্রেসের  প্রিয়রঞ্জনদাস মুন্সী ১৯৭৩ সালে বার্লিনে দশম বিশ্ব যুব সম্মেলনে 
শেখ মণির প্রদত্ত ইংরেজি ভাষায় রাখা বক্তব্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। 

১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ দিবসে শেখ শেখ মণির বক্তব্যের প্রশংসা করেন জাতিসংঘ বাংলাদেশ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহম্মদ হোসেন।

১৯৭৫ সালের ১৪ই আগস্ট বাকশালের ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিনের মূল বক্তা ছিলেন শেখ মণির বক্তৃতা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন- “আমার জীবনে এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।”

 

বাকশাল ও শেখ ফজলুল হক মণি:

 

বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৫ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান হন বঙ্গবন্ধু এবং এর ৩ জন সেক্রেটারি ছিলেন- জিল্লুর রহমান, শেখ মণি ও আবদুর রাজ্জাক। জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় যুবলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগ- এই চারটি অঙ্গ সংগঠন গঠিত হয়। 

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বৃহস্পতিবার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের প্রতি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে ৬৪ জেলায় একজন করে বাকশালের সম্পাদক এবং একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। বেইলি রোডের একটি বাড়িতে ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিন ছিল ১৪ আগস্ট। ওইদিন মূল বক্তা ছিলেন শেখ মণি। বাকশালের নীতি-আদর্শ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে শেখ মণি প্রায় দেড় ঘণ্টার এক অনবদ্য ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন- “আমার জীবনে এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।”

 

১৫ আগস্ট ১৯৭৫

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। 


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য ধানমন্ডির বাসভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।‌ পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং তার ছেলে আরিফ ও সুকান্তবাবু, মেয়ে বেবি,  মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি সেরনিয়াবাত এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। 

 

এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।

 

ঘাতকের দল প্রথমেই শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্ত:সত্তা স্ত্রী আরজু মণি সেরনিয়াবাতকে হত্যা করে। 

আগস্টের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিবরণীর স্মৃতিকথায় শেখ ফজলুল হক মণি ও 
আরজু মণি সেরনিয়াবাত এর  জ্যেষ্ঠপুত্র বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের বর্তমান চেয়ারম্যান শেখ ফজলে সামস পরশ তাঁর লেখা ‘নির্বাসনের দিনগুলি’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনায় উল্লেখ করেন—‘‘আমার মা মনে হয় বাবাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। তাই প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়েই মা বাবার সামনে মানবঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। সেই মুহূর্তে তিনি আমাদের কথাও ভাবেন নাই। মা স্বামীর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উদাহরণ রেখে গেছেন। হয়তো বা গুলি লাগার পরে তাঁর আমাদের দুই ভাইয়ের কথা মনে হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফিরে আসার আর উপায় ছিল না। তখনই মা চাচিকে বললেন, ‘ফাতু আমাকে বাঁচাও। আমার পরশ-তাপস! ওদেরকে তুমি দেইখো।’ ওটাই বোধ হয় মার শেষ কথা।”

 

অবুঝ দুই শিশুপুত্র শেখ ফজলে শামস পরশ ও শেখ ফজলে নূর তাপসকে রেখে বাংলার স্বাধীনতা-সংগ্রামের বিপ্লবী বীর শহীদ ‌শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁর সহধর্মিণী আরজু মণি সেরনিয়াবাত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক মদদপুষ্ট দেশীয় কিছু সেনা ঘাতকের নির্দয় বুলেট বিদ্ধ হয়ে মৃত্যু আলিঙ্গন করে ইহকাল ত্যাগ করেন।

 

মূলত, ৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকেই বাংলাদেশে এক বিপরীত ধারার যাত্রা শুরু হয়। বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক শাসনের অনাচারী ইতিহাস রচিত হতে থাকে।

 

সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প।

 

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।

 

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে। 

 

দ্য টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় 'সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ, তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।

 

একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছে, 'বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।'

 

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে।

 

পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সকে আইন হিসেবে অনুমোদন করে।

 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সুদীর্ঘ একুশ বছর পর ক্ষমতায় এলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামী বরখাস্ত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন।

 

১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর খুনিদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ৬ আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।

 

১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রের নানা বাধার কারণে ৮বার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। 

 

এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। 

 

অন্যদিকে, ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় দেন। বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বজায় রাখেন। 

 

কিন্তু অপর বিচারক এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেন।

 

পরবর্তীতে ২০০১ সালের অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচার কাজ বন্ধ থাকে।

 

দীর্ঘ ৬ বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের ৩ সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামিকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন।

 

২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর ২৯ দিনের শুনানির পর চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওইদিন (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৫ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়। 

 

২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর করে জাতিকে দায়মুক্ত করা হয়।

 

২০২০ সালের ১২ এপ্রিল ভারতে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর আরও একজন খুনি আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 

 

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার ৪৫ বছর, নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের মামলার ২৫ বছর এবং উচ্চ আদালতের রায়ে ৫ আসামির ফাঁসি কার্যকরের প্রায় ১০ বছর পর গ্রেপ্তার হয় খুনি মাজেদ।

comment / reply_from